অর্থমন্ত্রীকে চট্টগ্রাম চেম্বারের চিঠি

জাহাজ নিবন্ধনের বয়সসীমা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশের পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজ নিবন্ধনের বয়সসীমা ২৫ থেকে কমিয়ে ১০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই)। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে গতকাল পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটি বলেছে, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশীয় জাহাজ শিল্পের বিকাশ, নতুন বিনিয়োগ, নাবিকদের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

চেম্বার সভাপতি মোহাম্মেদ আমিরুল হক স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ প্রতি বছর সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। বিপরীতে এ খাত থেকে দেশের আয় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া বাংলাদেশী নাবিকদের মাধ্যমে আরো ১ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আসে। বর্তমানে দেশের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত পণ্যের মাত্র ১১-১২ শতাংশ বহন করে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজগুলো। জাতীয় নৌবহরের আকার বাড়ানো গেলে বিদেশী জাহাজের ওপর নির্ভরতা কমবে, দেশীয় পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জাহাজ মেরামত ও লজিস্টিকসসহ সহায়ক শিল্প বিকশিত হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের অন্তত ৫০ শতাংশ বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনে সক্ষমতা অর্জন করতে হলে কয়েকশ জাহাজের নৌবহর গড়ে তোলা প্রয়োজন।

চিঠিতে আরো বলা হয়, ‘বাংলাদেশ পতাকাবাহী জাহাজ (স্বার্থ সুরক্ষা) আইন’-এর বিভিন্ন প্রণোদনার কারণে এরই মধ্যে অনেক দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী ও উদ্যোক্তা সমুদ্রগামী জাহাজে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে নিবন্ধনের বয়সসীমা ১০ বছরে নামিয়ে আনা হলে তুলনামূলক কম দামের ব্যবহৃত জাহাজ কেনার সুযোগ সংকুচিত হবে। কারণ ১০ বছরের কম বয়সী জাহাজের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেশি হওয়ায় অনেক সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর জন্য এ খাতে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্বের প্রধান সামুদ্রিক দেশগুলো জাহাজ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বয়সের পরিবর্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ক্ল্যাসিফিকেশন, রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাস, বিধিবদ্ধ সনদ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণের বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। চীন, হংকং ও পানামার মতো দেশে জাহাজ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমা নেই। আবার গ্রিস, জাপান, সিঙ্গাপুর, লাইবেরিয়া ও মাল্টার মতো দেশেও অনুমোদিত বয়সসীমা ১০ বছর, অনেক ক্ষেত্রে ২০ বছরেরও বেশি। আবার কিছু দেশে তা ৩০ বছর পর্যন্ত নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) নির্দেশনা অনুযায়ী, ইন্টরন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ক্ল্যাসিফিকেশন সোসাইটিজের (আইএসিএস) সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তত্ত্বাবধানে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বাধ্যতামূলক ড্রাই-ডকিং, পরিদর্শন ও জরিপ সম্পন্ন করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। এ কারণে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে শুধু বয়স নয়; বরং কারিগরি ও নিরাপত্তাজনিত মানদণ্ড বিবেচনা করাই যথেষ্ট বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি জানান, বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার বাংলাদেশী কর্মকর্তা ও নাবিক বিশ্বের বিভিন্ন জাহাজে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া প্রতিবছর দেশের সামুদ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৮০০ নতুন ক্যাডেট স্নাতক সম্পন্ন করছে। এসব ক্যাডেটদের ব্যবহারিক সমুদ্র প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই জাতীয় নৌবহরের সম্প্রসারণ নাবিকদের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতেও সহায়ক হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘দেশের সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন থেকে আয় বৃদ্ধি, নাবিকদের কর্মসংস্থান, স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগের প্রসার এবং সমুদ্রগামী জাহাজ শিল্পের বিকাশের স্বার্থে প্রস্তাবিত বাজেটে জাহাজ নিবন্ধনের বয়সসীমা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার জন্য মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

আরও